শ্রীকৃষ্ণই যদি একমাত্র পরমেশ্বর ভগবান হন, তবে বেদে শ্রীকৃষ্ণকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভগবান বলা তো দূরের কথা, শ্রীকৃষ্ণের কোনো উল্লেখ পর্যন্ত নেই কেন ?

     

 প্রশ্নটি করার জন্য ধন্যবাদ       

  

              ভগবান শ্রীকৃষ্ণই যে পরমেশ্বর সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মাহাভারতের 'আনুশাসন পর্বের' আন্তরগত 'দানধর্ম পর্বের ১৭৮ তম আধ্যায়ে স্বয়ং 'মাহাদেব' তার মাহিমা বর্ণনা করেছেন। 



শ্রীমদ্ভাগবত গীতা
৪র্থ অধ্যায়: জ্ঞানযোগ

श्रीभगवानुवाच |
यदा यदा हि धर्मस्य ग्लानिर्भवति भारत |
अभ्युत्थानमधर्मस्य तदात्मानं सृजाम्यहम् || 7||

परित्राणाय साधूनां विनाशाय च दुष्कृताम् |
धर्मसंस्थापनार्थाय सम्भवामि युगे युगे || 8||

আনুবাদ - হে ভারত ! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই। সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।


                সানাতন ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু 'মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহাদি' ভিন্ন ভিন্ন রূপে অবতীর্ণ হয়ে ধর্মস্থাপনা করেন। "বৈবস্বত মন্বান্তরের ২৮ তম দ্বাপরে" তিনি সম্পূর্ণ কলায় অবতীর্ণ হন, তাহাই হল কৃষ্ণ অবতার। তাই অধিকাংশ ভক্ত তাকে কৃষ্ণ রুপেই বর্ণনা করে। যদিও তার বিষ্ণু রূপই বাস্তবিক পরমব্রহ্ম রুপ। এই কারনে বেদে তার কৃষ্ণ নামের উল্লেখ নেই কারন বেদ তার পূর্বেই রচিত। তাই বেদে তার কৃষ্ণ নাম না খুঁজে আপনি যদি তাকে বিষ্ণু নামে খুজতেন তাহলে খুব সহজেই পেয়ে যেতেন।

               'রামায়ণ, মাহাভারত' তথা 'শ্রীমদ্ভাগবত গীতায়' তাকে পরমেশ্বর বলা হয়েছে, তাই দেখা যাক বেদের সাথে উপরোক্ত গ্রন্থ গুলির ব্যাখ্যা মেলে কিনা।


প্রথমে দেখি বেদ ও উপনিশদে ভগবান বিষ্ণু সম্বন্ধে কি বলা হয়েছে


ঋগ্বেদ ১:২২

त्रीणि पदा वि चक्रमे विष्णुर्गोपा अदाभ्यः । अतो धर्माणि धारयन्॥१८॥

অনুবাদ - বিশ্বরক্ষক, অবিনাশি বিষ্ণুদেব ত্রিলোকে যজ্ঞাদি কর্ম ঘোষিত করে তিন চরণ দ্বারা জগতব্যাপ্ত। তিনি তিন শক্তিধারা (সৃজন, পোষণ ও পরিবর্তন) দ্বারা বিশ্বের সঞ্চালন করেন।

तद्विष्णोः परमं पदं सदा पश्यन्ति सूरयः । दिवीव चक्षुराततम्॥२०॥

तद्विप्रासो विपन्यवो जागृवांसः समिन्धते । विष्णोर्यत्परमं पदम्॥२१॥

অনুবাদ - যে প্রকার সামান্য নেত্র দ্বারা আকাশে স্থিত সূর্যদেব কে সহজেই দেখা যায়, তেমনই জ্ঞানীজন নিজের জ্ঞানচক্ষু দ্বারা বিষ্ণুদেবের পরম স্বত্বা দর্শন করেন, এবং সেই পরমপদ প্রাপ্ত হন। (দুটি শ্লোক একসাথে)


যজুর্বেদ ৩১

श्रीश्च ते लक्ष्मीश्च पत्न्यावहोरात्रे पार्श्वे नक्षत्राणि रूपमश्विनौ व्यात्ताम् ।

 इष्णन्निषाणामुं म इषाण सर्वलोकं म इषाण ॥२२॥

অনুবাদ - হে প্রকাশ স্বরুপ পরমাত্মা ! সকলকে সম্পন্নতা প্রদানকারী বৈভবরূপী লক্ষ্মী আপনার পত্নী স্বরূপ, আপনার ভুজা রাত্রি ও দিন এবং নক্ষত্র আপনার রূপ। দ্যুলোক এবং পৃথিবী আপনার মুখ সদৃশ। মাত্র ইচ্ছাশক্তি দ্বারা সকলের ইচ্ছা পূরণকারী হে ঈশ্বর আমাদের উত্তম লোক প্রাপ্তির ইছা প্রাপ্তির জন্য আপনি কৃপা করুন।


কঠ উপনিষদ ১:৩

आशा प्रतीक्षे संगतं सूनृतां च इष्टापूर्ते पुत्रपशूंश्च सर्वान् ।

 एतद् वृड्क्ते पुरुषस्याल्पमेधसो यस्यानश्नन् वसति ब्राह्मणो गृहे ॥८॥

্तिসাথस्त्रो रात्रीर्यदवात्सीर्गृहे मे अनश्नन् ब्रह्मन्नतिथिर्नमस्य : ।

 नमस्ते अस्तु ब्रह्मन् स्वस्ति में अस्तु तस्मात् प्रति त्रीन् बरान् वृणीष्व ॥९॥

অনুবাদ - যার বিবেক তথা মন পবিত্র, সে সেই পরমপদ প্রাপ্ত হয় যেখান থেকে আর পুনর্জন্ম হয়না। বিজ্ঞান অর্থাৎ বুদ্ধি যার সারথি তথা মন রূপী লাগাম যার বশে সে সংসার পার করে বিষ্ণুর সেই পরম পদ প্রাপ্ত হয়।


শুধু এটুকুই নয় বেদে যে বিরাট পুরুষের কথা বলা হয়েছে তিনি বাস্তবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ/বিষ্ণু।


অথর্ব বেদ ১৯.৬
जगद्वीजपुरुष सूक्त

सहस्रबाहुः पुरुषः सहस्राक्षः सहस्रपात्। स भूमिं विश्वतो वृत्वात्यतिष्ठद्दशाङ्गुलम् ॥१॥

আনুবাদ - যিনি সাহস্র ভুজা, সহস্র নেত্র তথা সহস্র চরণ জুক্ত বিরাট পুরুষ, উনি সম্পূর্ণ ভুমি আবৃত্ত করেও তার বিস্তার দশ আঙ্গুলি বেশি।

১১শ অধ্যায়: বিশ্বরূপদর্শনযোগ

শ্রীভগবানুবাচ
পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোহথ সহস্রশঃ ।
নানাবিধানি দিব্যানি নানা বর্ণাকৃতীনি চ ॥৫॥

অনুবাদ : শ্রীভগবান বললেন- হে পার্থ ! নানা বর্ণ ও নানা আকৃতি-বিশিষ্ট শত শত ও সহস্র সহস্র আমার বিভিন্ন দিব্য রূপসমূহ দর্শন কর।

অর্জুন উবাচ
অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং
পশ্যামি ত্বাং সর্বতোহনন্তরূপম্ ।
নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং
পশ্যামি বিশ্বেশর বিশ্বরূপ ॥১৬॥

অনুবাদ : হে বিশ্বেশ্বর ! হে বিশ্বরূপ ! তোমার দেহে অনেক বাহু, উদর, মুখ এবং সর্বত্র অনন্ত রূপ দেখছি। আমি তোমার আদি, মধ্য ও অন্ত কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং হি
ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ ।
দৃষ্ট্বাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদং
লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্ ॥২০॥

অনুবাদ : তুমি একাই স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যবর্তী অন্তরীক্ষ ও দশদিক পরিব্যাপ্ত করে আছ। হে মহাত্মন্ ! তোমার এই অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর রূপ দর্শন করে ত্রিলোক অত্যন্ত ভীত হচ্ছে।


অথর্ব বেদ ১৯.৬
जगद्वीजपुरुष सूक्त

त्रिभिः पद्भिर्द्यामरोहत्पादस्येहाभवत्पुनः । तथा व्यक्रामद्विष्वङशनानशने अनु ॥२॥

আনুবাদ - বিরাট পুরুষ চার ভাগে বিভক্ত যার এক রূপে এই সম্পূর্ণ সংসার (জড় এবং চেতনাযুক্ত) বিবিধ রূপে সমাহিত। তার বাকি তিন ভাগ অনন্ত অন্তরিক্ষে সমাহিত।

মহাভারতের 'দ্রোণপর্বে' ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের চার রূপ বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, "আমি এক রূপে বদ্রিকাশ্রম থেকে জগতের পালন করি"। (ভগবানের পালনহার রূপ, যা সংসারে সমাহিত)

"দ্বিতীয় রূপে আমি রসাতলে থেকে সম্পুর্ণ সৃষ্টি ধারণ করি"। (ভগবানের তামসিক রূপ যাকে 'শেষনাগ' বা 'অনন্ত' বলা হয়)

"তৃতীয় রূপে অদৃশ্য থেকে আমি সকল জীবের ওপর নজর রাখি এবং তাদের কর্মফল প্রদান করি"। (নিরাকার ব্রহ্ম)

"চতুর্থ রূপে পরমধামে অনন্ত সজ্জায় সজ্জিত হয়ে সম্পুর্ণ জগতকে শক্তি প্রদান করি"। (চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপ)

[এই তিন দিব্য রূপ অন্তরিক্ষে সমাহিত]


অথর্ব বেদ ১৯.৬
जगद्वीजपुरुष सूक्त

चन्द्रमा मनसो जातश्चक्षोः सूर्यो अजायत । मुखादिन्द्रश्चाग्निश्च प्राणाद्वायुरजायत ॥७॥

আনুবাদ - সেই বিরাট পুরুষ পরমাত্মার মন থেকে চন্দ্রমা, নেত্র থেকে সূর্য, মুখ থেকে ইন্দ্র এবং অগ্নি তথা প্রান থেকে বায়ু প্রকট হয়েছে।

১০ম অধ্যায়: বিভূতিযোগ

শ্রীভগবানুবাচ

ন মে বিদুঃ সুরগণাঃ প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ ।
অহমাদির্হি দেবানাং মহর্ষীণাং চ সর্বশঃ ॥২॥

অনুবাদ : দেবতারা বা মহর্ষিরাও আমার উৎপত্তি অবগত হতে পারে না, কেন না, সর্বতোভাবে আমিই দেবতা ও মহর্ষিদের আদি কারণ।


অথর্ব বেদ ১৯.৬
जगद्वीजपुरुष सूक्त

तस्माद्यज्ञात्सर्वहुत ऋचः सामानि जज्ञिरे । छन्दो ह जज्ञिरे तस्माद्यजुस्तस्मादजायत ॥१३॥

অনুবাদ - সেই বিরাট যজ্ঞপুরুষ থেকে ঋগ্বেদ এবং সামবেদ প্রকট হয়। তার থেকেই যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ প্রকট হয়।

৯ম অধ্যায়: রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ

শ্রীভগবানুবাচ

পিতাহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ ।
বেদ্যং পবিত্রম্ ওঙ্কার ঋক্ সাম যজুরেব চ ॥১৭॥

অনুবাদ : আমিই এই জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা ও পিতামহ৷ আমি জ্ঞেয় বস্ত্ত, শোধনকারী ও ওঙ্কার৷ আমিই ঋক্, সাম ও যজুর্বেদ।


যজুর্বেদ ৩১

वेदाहमेतं पुरुषं महान्तमादित्यवर्णं तमसः परस्तात् ।

 तमेव विदित्वाति मृत्युमेति नान्यः पन्था विद्यते यनाय ॥१८॥

অনুবাদ - সূর্যের সমতুল্য তেজসম্পন্ন, অন্ধকাররহিত সেই বিরাট পুরুষ যাকে জানার পর সাধকের মোক্ষলাভ হয়। মোক্ষ প্রাপ্তির এই একমাত্র পথ, এই ভিন্ন আর কোনো পথ নেই।

১০ম অধ্যায়: বিভূতিযোগ

শ্রীভগবানুবাচ

যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্ ।
অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে ॥৩॥

অনুবাদ : যিনি আমাকে জন্মরহিত, অনাদি ও সমস্ত গ্রহলোকের মহেশ্বর বলে জানেন, তিনিই কেবল মানুষদের মধ্যে মোহশুন্য হয়ে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন।


যজুর্বেদ ৩১

रुचं ब्राह्म्यं जनयन्तो देवा अग्रे तदब्रुवन् । यस्त्वैवं ब्राह्मणो विद्यात्तस्य देवा असन्वशे ॥२१॥

অনুবাদ - প্রজাপালক পরমাত্মার সত্তা সম্পূর্ণ পদার্থে বিদ্যমান, তিনি অজন্মা হয়েও বহু রূপে প্রকট হন। তার কারন শক্তি সম্পূর্ণ ভুবনে সমাহিত। জ্ঞানীজনই তার প্রকৃত স্বরুপ দেখতে পান।

৪র্থ অধ্যায়: জ্ঞানযোগ

ভগবান উবাচ
অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্ ।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ।।৬।।

অনুবাদ : যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।


ঋগ্বেদ ১০:৮২

तमिद्गर्भं प्रथमं दध्र आपो यत्र देवाः समगच्छन्त विश्वे ।

 अजस्य नाभावध्येकमर्पितं यस्मिन्विश्वानि भुवनानि तस्थुः॥६॥

অনুবাদ - সৃষ্টির আদিতে সেই পরমতত্ত্ব অপতত্ত্ব গর্ভে ধারন করলেন যা সম্পূর্ণ দেবশক্তির আশ্রয়স্থল। সেই অজন্মা ঈশ্বরের নাভিকেন্দ্রে পরমতত্ব অধিষ্ঠিত যাতে সমস্ত ভুবন আরক্ষিত হয়ে স্থিত।

'ব্রহ্মপুরাণ' মতে সরবপ্রথম ভগবান বিষ্ণুর নাভিপদ্মে 'হিরণ্যগর্ভের' (তেজময় স্বর্ণ ডিম্ব) উৎপত্তি হয় , এই হিরণ্যগর্ভেই ব্রহ্মার জন্ম হয়। ব্রহ্মা হিরণ্যগর্ভে ১০০ বছর বাস করার পর তা ভেঙ্গে সৃষ্টি নির্মাণ করেন।


আশা করি আর কোনো সন্দেহ নেই।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কৃষ্ণ কেন রাধাকে বিয়ে করেননি যেখানে তিনি এতগুলি বিবাহ করেছিলেন ? তবে কেন তার রাধার সাথে নাম নেওয়া হয় ?

ধর্ম পৃথিবীতে কিভাবে এলো ?

সূর্য বংশীয় রাজা এবং চন্দ্র বংশীয় রাজা কাদের বলা হয় ?