ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঠিক কতজনকে বিবাহ করেছিলেন ? তার কতগুলি সন্তান ছিল ?
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পত্নীদের বিস্তারিত বিবরণ "শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরানের দশম স্কন্দে" দেওয়া হয়েছে। আমি সেখান থেকে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করছি।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের '৮ জন' প্রধানা পত্নী ছিলেন, যাদেরকে 'অষ্টভার্যা' বলা হয়।
১/ রুক্মিনী
রুক্মিনী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রথম পত্নী এবং 'বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের' কন্যা ছিলেন। রুক্মিনীর অগ্ৰজ রুক্মি তার বিবাহ 'শিশুপালের' সাথে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু রুক্মিনী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে নিজের পতি রূপে বরণ করতে চেয়েছিলেন। এই কারনে তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে গোপনে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পত্র পাঠিয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ 'রুক্মিকে' পরাজিত করে রুক্মিনীকে হরন করে নিয়ে যান।
২/ সত্যভামা
সত্যভামার পিতা 'সত্রাজিত' দ্বারকা নগরীর সবথেকে ধনবান ব্যাক্তি ছিলেন। তার কাছে 'সূর্যদেবের' কাছ থেকে বরদানে পাওয়া দিব্য 'সামন্তক মনি' ছিলো যা প্রতিদিন '২০ মন' সোনা উৎপন্ন করতো। কিন্তু সত্রাজিতের সন্দেহ হয় যে শ্রীকৃষ্ণ হয়তো মনিটি চুরি করতে চান। এই সন্দেহে তিনি সেই মনি তার ভাই 'প্রসেনজিৎ' কে দেন। প্রসেনজিৎ সেই মনি নিয়ে বনে শিকারে যান এবং একটি সিংহ দ্বারা নিহত হন। এর ফলে সত্রাজিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওপর হত্যা এবং চুরির আরোপ লাগান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন তাকে সেই মনি খুঁজে এনে দেন।
মনি পাওয়ার পর সত্রাজিত অনুতপ্ত হন এবং "সামন্তক মনি সহ নিজের কন্যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে দান করেন"।
৩/ জাম্ববতী
জাম্ববতী 'জাম্ববানের' কন্যা ছিলেন। 'প্রভু শ্রীরামচন্দ্র' যখন লীলা সমাপ্ত করেন তখন তিনি জাম্ববানকে বলেন, "তুমি দ্বাপরযুগের শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকবে এবং দ্বাপরের শেষে আমি বাসুদেব রূপে এসে তোমায় মুক্তি দেব"।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন 'সামন্তক মনি' সন্ধান করছিলেন সেই সময় জাম্ববানের সাথে তার দেখা হয় এবং তিনি জাম্মবানকে মুক্তি প্রদান করেন এবং জাম্ববানের অনুরোধে তার কন্যা জাম্ববতীকে বিবাহ করেন।
৪/ কালিন্দী
'সূর্যদেবের' কন্যা 'যমুনা' কৃষ্ণ বর্ণা হওয়ার কারনে কোনো পুরুষ তাকে বিবাহ করতে চায়নি। তখন যমুনা প্রতিজ্ঞা করেন, "সকল পুরুষের মধ্যে উত্তম পুরুষোত্তমকেই তিনি পতি রূপে লাভ করবেন"। এই উদ্দেশ্যে তিনি ভগবান বিষ্ণুর তপস্যা করেন এবং তার তপস্যার ফল স্বরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে পত্নী রূপে গ্ৰহন করেন। এই দেবী যমুনাই 'কালিন্দী'।
৫/ মিত্রবৃন্দা
'রাজা জয়সেনের' কন্যা ছিলেন মিত্রবৃন্দা। মিত্রবৃন্দার দুই অগ্রজ 'বিন্দ ও অনুবিন্দ' শ্রীকৃষ্ণ কে নিজেদের শত্রু মনে করতেন। মিত্রবৃন্দার স্বয়ংবরে তার সকল ভ্রাতাদের পরাজিত করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে বিবাহ করেন।
৬/ সত্যা
কোশলরাজ 'নগ্নজিতের' শর্ত অনুযায়ী "একসাথে তার সাতটি ষাড়কে শ্রীকৃষ্ণ এক আঙ্গুল দ্বারা তাদের জায়গা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিলেন"। এতে প্রসন্ন হয়ে নগ্নজিত তার কন্যা সত্যার বিবাহ শ্রীকৃষ্ণের সাথে দিয়েছিলেন।
৭/ ভদ্রা
রাজা 'দৃষ্টকেতুর' কন্যা ভদ্রা পূর্বজন্মে 'ভগবান বিষ্ণু' কে পতি রূপে লাভ করার উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা করেন। এই কারনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে তার বিবাহ হয়। কোনো কোনো মতে এই "ভদ্রা পূর্বজন্মে সুরপনাখা" ছিলেন।
৮/ লক্ষনা
দ্রৌপদী স্বয়ংবরের মতো লক্ষনার স্বয়ংবরেও এক অদ্ভুত লক্ষভেদের প্রতিযোগিতা হয়েছিল। এই প্রতিযোগিতায় জিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ লক্ষনাকে বিবাহ করেন।
এই ভাবে তিনি অষ্টভার্যা গ্রহন করেন।
এরপর একদিন 'নরকাসুরের' আতঙ্কে স্বর্গচ্যুত হয়ে 'দেবরাজ ইন্দ্র' দ্বারকায় আসেন এবং সাহায্য প্রার্থনা করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার প্রার্থনা শুনে 'সত্যভামা' ও 'গরুড়কে' সাথে নিয়ে যুদ্ধ করতে যান এবং নরকাসুরকে বধ করেন।
নরকাসুর '১৬১০০' কন্যাকে হরন করে এনেছিল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাদের মুক্ত করেন। কিন্তু তার মুক্তি পেতেই প্রাণ বিসর্যন দিতে যান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাদের বলেন, "তোমরা তো এখন মুক্ত, তবে তোমরা আত্মহত্যার মতো মহাপাপ কেনো করতে যাচ্ছো?" উত্তরে তারা জানায় "পরপুরুষ দ্বারা হরন করা স্ত্রীকে সমাজ কখনো মেনে নেয়না। এখন তাদের সমাজে কোনো পরিচয় এবং কোনো স্থান নেই" তাই আত্মহত্যাই তাদের একমাত্র পথ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাদের বলেন, "তবে আমি তোমাদের পত্নি রূপে গ্ৰহন করবো। কিন্তু মনে রেখো এই বিবাহ কেবল তোমাদের সামাজিক সম্মান প্রদানের জন্যই হচ্ছে। এর থেকে বেশী তোমরা কোনোদিন কিছু আশা করো না"।
এইভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মোট '১৬১০৮' পত্নী ছিল। তবে নরকাসুর দ্বারা অপহৃত ১৬১০০ জন কন্যাদের তিনি কেবল সামাজিক পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তার ৮ জনই পত্নী ছিল।
এই অষ্টভার্যার প্রত্যেকেরই "দশ পুত্র ও এক কন্যা অর্থাৎ ৮০ পুত্র ও ১০ কন্যা" হয়েছিল। তাদের নামের তালিকা নীচে দেওয়া হল।
রুক্মিনী
১/ প্রদ্যুম্ন
২/ চারুদেশ্ন
৩/ সুদেশ্ন
৪/ মিত্রদেশ্ন
৫/ চারুচন্দ্র
৬/ চারুগুপ্ত
৭/ ভদ্রচারু
৮/ সুচারু
৯/ বিচারু
১০/ চারু\
সত্যভামা
১/ ভানু
২/ সুভানু
৩/ প্রভানু
৪/ স্বরভানু
৫/ ভানুমান
৬/ অতিভানু
৭/ চন্দ্রভানু
৮/ বৃহাদ্ভানু
৯/ শ্রীভানু
১০/ প্রতিভানু
জাম্ববতী
১/ শাম্ব
২/সুমিত্র
৩/ পুরজিত
৪/ শহস্রজিত
৫/ শতজিত
৬/ ক্রতু
৭/ বসুমান
৮/ দ্রাবিড়
৯/ চিত্রকেতু
১০/ বিজয়
কালিন্দী
১/ শ্রুত
২/ বীর
৩/ সুবাহু
৪/ বৃষ
৫/ কবি
৬/ ভদ্র
৭/ শান্তি
৮/ দর্শ
৯/ পুরনমাস
১০/ সৌমক
মিত্রবৃন্দা
১/ বৃক
২/ বর্ধন
৩/ গৃধ
৪/ অনিল
৫/ হর্ষ
৬/ পবন
৭/ বহিন
৮/ অন্নাদ
৯/ ক্ষুধি
১০/ মহাংশ
সত্যা
১/ বেগ
২/ বেগবান
৩/ চিত্রগু
৪/ চন্দ্র
৫/ অশ্বসেন
৬/ শঙ্কু
৭/ বসু
৮/ কুন্ত
৯/ আম
১০/ বৃষভ
ভদ্রা
১/ অরিজিত
২/ প্রহরণ
৩/ শূর
৪/ বৃহদসেন
৫/ সংরামজিত
৬/ সত্যক
৭/ আয়ু
৮/ বাম
৯/ সুভদ্র
১০/ জয়
লক্ষনা
১/ প্রঘোষ
২/ প্রবল
৩/ বল
৪/ সিংহ
৫/ উদ্গ্রাব
৬/ অপরাজিত
৭/ অজ
৮/ সহ
৯/ মহাশক্তি
১০/ গাত্রবান
এছারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৮ জন কন্যা ছিল। তবে তাদের মধ্যে কেবল "রুক্মিনি কন্যা চারুমতির" নামই জানা যায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন