মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় অর্জুনের সঙ্গে যদি শ্রীকৃষ্ণের যায়গায় গৌতম বুদ্ধ থাকতেন তবে তিনি অর্জুনকে কি উপদেশ দিতেন ? তখন ও কি যুদ্ধ হতো ?

 প্রথমে আমরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি শ্লোক স্মরণ করে নিই

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।। ৭ 

পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।

ধর্মসংর্স্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।। ৮


অর্থাৎ, যখন যখন ধর্মের গ্লানি ঘটে এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে, তখন তখন "সাধুজনের রক্ষার জন্য, অধর্মের বিনাশের জন্য এবং ধর্মের পুনঃস্থাপনার জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

        ভগবান তার অবতারের সংখ্যা কখনই নিশ্চিত করে যাননি। কিন্তু পুরাণের বিবরণ অনুসারে ৬৪ অবতার, ৩৯ অবতার, ২৪ অবতারের তালিকা বানানো হয়েছে।  কিন্তু তার ১০ অবতারের তালিকা সবথেকে জনপ্রিয়। কারন এই ১০ অবতারে যেমন বিবর্তনবাদ কে দেখানো তেমন বিভিন্ন সময়ে সমাজ ব্যবস্থাকেও দেখানো হয়েছে।

এই ১০ অবতার হলো -

"মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, কৃষ্ণ ও কল্কি"। এটি সবথেকে ১০ অবতারের পুরনো তালিকা। কোনো কোনো তালিকায় "শ্রীকৃষ্ণ কে অষ্টম এবং গৌতম বুদ্ধ কে নবম" অবতার হিসেবে দেখানো হয়।

         এখন বিবর্তনবাদের সাথে এর মিল দেখুন, "জগতে সর্ব প্রথম জলচর প্রাণীর উৎপত্তি হয়, তো ভগবানের প্রথম অবতার মৎস্য। এরপর কিছু প্রাণী ডাঙায় উঠে আসে আর উভচর দের উৎপত্তি হয়, ডাইনোসর এর বেশির ভাগ প্রজাতি উভচর ছিলো, ভগবানের দ্বিতীয় অবতার কূর্ম, এক উভচর। এরপর স্থলচর প্রাণীর উৎপত্তি হয়, তাই তৃতীয় অবতার বরাহ। এরপর বানর জাতির উৎপত্তি হয় যা অনেকটা মানুষের মতোই ছিল, তাই ভগবানের চতুর্থ অবতার নৃসিংহ"।

        এরপর "জগতের প্রথম মানব জাতির উৎপত্তি হয় যারা শারীরিক ভেবে খর্বাকৃতির হতো, তাই ভগবানের পঞ্চম অবতার বামন। এরপর মানুষ শিকার করতে শেখে তাই সেই সময়কার মানুষ খুব হিংস্র প্রকৃতির হতো, ষষ্ঠ অবতার হলো পরশুরাম। এরপর থেকে আসে সমাজিক মানুষ, তাই এর পরের অবতার গুলি রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ।

উল্লেখ্য যে বরাহ ও নৃসিংহ অবতারে কূর্মো অবতারের আগে এসেছিলেন কিন্তু বিবর্তনবাদকে দেখানোর জন্যই কূর্ম অবতার দ্বিতীয় স্থান পায়।

         এরপর আসি সমাজ ব্যবস্থায়, সত্য যুগে কারো মনে কোনো পাপ ছিলো না, সবাই ধার্মিক ছিলো এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন যাপন করতো, অধর্মির তালিকায় কয়েকটি অসুর মাত্র ছিলো। ত্রেতা যুগের প্রথম দিক পর্যন্ত সমাজ এরকম ছিলো, তাই এই সময়ের অবতার সাময়িক, মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন। এরপর ত্রেতা যুগের মধ্যবর্তী সময়ে রাজাদের মনে তীব্র অহংকার হয় আর তারা অত্যাচরী হয়ে ওঠে, তখন সেই সকল ক্ষত্রিয় জাতির অহংকার নাশ করার জন্য অবতীর্ণ হন পরশুরাম। যিনি পৃথিবী থেকে ২১ বার ক্ষত্রিয় উচ্ছেদ করে সব রাজাদের অহংকার নাশ করেন। কিন্তু এত পরিমাণে ক্ষত্রিয় উচ্ছেদ করায় অনেক রাজ্য অরাজকতায় ভোগে, তার ফলে চারিদিকে চুরি, ডাকাতি শুরু হয়। এই অনাচার রোদ করার জন্য কঠোর আইন শৃঙ্খলা প্রয়োজন হয়, তো তখন বিভিন্ন রকম সংবিধান গঠন করা হয়। এবার মর্যাদা যখন স্থাপন হলো তখন মর্যাদা পুরুষোত্তম ও আসবেন, তখন ভগবান রাম রূপে অবতীর্ণ হন, যে অবতার সকল মর্যাদা পালনের শীর্ষে। ত্রেতা যুগের শেষ অবতার। এরপর দ্বাপর যুগে দেখা যায় যে নিয়মের মধ্যে থেকেও অধর্ম করা যায়। যখন এরকম পরিস্থিতি আসে যখন নিয়ম বদলাতে হয়, এমন সময়ে দ্বাপরের শেষদিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হন। যিনি মর্যাদা ভেঙে মর্যাদা স্থাপন করেন এবং সমাজের পরিবর্তন আনেন। তিনি বোঝান যে "তুমি যেটা করছো সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেই কাজের পেছনে যে কারন আছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।" এরপর কলিযুগ শুরু হয় এবং কলির প্রভাবে মানুষের জীবনে দুঃখ ঘনিয়ে আসে, তখন তাদের পথ দেখানোর জন্য ভগবান বুদ্ধ রূপে অবতীর্ণ হন। এখন কলিযুগ চলছে আর এই কলিযুগে মানুষের দুঃখের শেষ নেই, চারিদিকে পাপ আর অনাচার। বলা হয় এই ঘোর কলিতে সেই শুদ্ধ যে কোনো পাপ করার সূযোগ পায়নি। অর্থাৎ সকলের জীবনেই কিছু না কিছু কলঙ্ক আছেই, তাই কলি যুগের শেষে ভগবান কল্কি রূপে অবতার নেবেন যা সম্পূর্ণ নিঃস্কলঙ্ক হবে। ভগবান এই কল্কি অবতারেই কলিযুগের অবসান ঘটিয়ে সত্যযুগের স্থাপনা করবেন।

         অর্থাৎ ভগবান পরিস্থিতি দেখে লীলা করেন, যখন যে কাজ করার অথবা করানোর প্রয়োজন তিনি তখন সেই কাজই করেন বা করান। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জায়গায় যদি বুদ্ধ থাকতেন তাহলে সেটা শুধু মাত্র নামের পার্থক্য হতো, কাজ একই থাকতো।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কৃষ্ণ কেন রাধাকে বিয়ে করেননি যেখানে তিনি এতগুলি বিবাহ করেছিলেন ? তবে কেন তার রাধার সাথে নাম নেওয়া হয় ?

ধর্ম পৃথিবীতে কিভাবে এলো ?

সূর্য বংশীয় রাজা এবং চন্দ্র বংশীয় রাজা কাদের বলা হয় ?