পাপের গুরু

          এক পন্ডিত, দীর্ঘ বছর কাশীতে শাস্ত্র অধ্যয়ন করার পর নিজ গ্রামে ফিরে এলেন। ফিরে আসার পর গ্রামের এক কৃষক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা পন্ডিতবাবু, আপনি তো অনেক লেখাপড়া করেছেন। আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন কি?"

পন্ডিত বললেন, "বল কি প্রশ্ন শুনি?"

তখন কৃষক বলল, "আচ্ছা পন্ডিতবাবু, এই সংসারে যত পাপ হচ্ছে, এই সব পাপের গুরু কে?"

             প্রশ্ন শুনে তো পন্ডিত হতচকিত হয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন, "ভৌতিক আর আধ্যাত্বিক এর গুরু তো হয়। কিন্তু পাপেরও কি গুরু হয়? এটাতো আমার জানা ছিলনা। এটাতো আমার বোঝার আর অধ্যয়নের সীমার বাইরে।"

              ততক্ষনাৎ কোন উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে তিনি ঘরে চলে এলেন। ঘরে এসে ভাবতে লাগলেন, "আমার অধ্যয়ন এখনও তবে পূর্ণ হয়নি।" এই ভেবে তিনি আবার কাশী চলে গেলেন। সেখানে তাঁর গুরুদেবের সাথে সাক্ষাৎ করলেন।কিন্তু তিনিও কোন উত্তর দিতে পারলেন না।এরপর অনেক মুনি- ঋষি, আর গুরুর সাক্ষাৎ করলেন। তবুও কোন উত্তর পেলেন না।

হঠাৎ একদিন এক পতিতার সাথে তাঁর দেখা হল। পন্ডিত কে চিন্তাগ্রস্থ দেখে পতিতা তার কারন জিজ্ঞেস করল। তখন পন্ডিত তাঁর প্রশ্নের কথাটা বললেন।

             শুনে পতিতা বলল, "আরে পন্ডিতবাবু, এটা তো খুবই সহজ। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে যে আপনাকে কিছুদিন আমাদের পাড়ায় এসে থাকতে হবে"। পন্ডিত সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলেন।তারপর পন্ডিতকে সেই পতিতা তার সাথে নিয়ে গিয়ে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে দিল।

             পন্ডিতের এক অভ্যাস ছিল, তিনি কারও হাতের কিছু খেতেন না। নিয়ম, আচার আর ধর্মের প্রতি তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাই তাঁর সব কাজ তিনি নিজের হাতে করতেন। এভাবে কিছুদিন কেটে যাওয়ার পরেও পন্ডিত তাঁর উত্তর পেলেন না। 

               একদিন পতিতা তাঁর কুটিরে এসে তাঁকে বলল, "পন্ডিতবাবু! আপনার তো অনেক কষ্ট হচ্ছে নিজের হাতে ভোজন তৈরী করতে। এখানে যে,কেও আপনার খেয়াল রাখবে, তাও তো নেই।আপনার যদি আপত্তি না থাকে তো আমি স্নান শুদ্ধি করে আপনার জন্য কিছু ভোজনের ব্যবস্থা করে দেই? আপনি আমাকে যদি এই সেবাটা করার সুযোগ দেন তো আমি দক্ষিনা হিসেবে আপনাকে পাঁচ স্বর্ণমুদ্রা করে প্রতিদিন দেব।"

             স্বর্ণমুদ্রার নাম শুনে পন্ডিতের মনে লোভ এসে গেল।আর সেই সাথে বিনা পরিশ্রমে সুস্বাদু ভোজনের প্রস্তাব। পন্ডিতের যেন একাদশীতে বৃহস্পতি লেগেছে।

              এই লোভে পন্ডিত তাঁর নিজের নিয়ম-ব্রত, আচার-বিচার, ধর্ম সব ভুলে গেলেন। পন্ডিত তখন সায় দিয়ে পতিতাকে বললেন, "ঠিক আছে তুমি যখন চাইছ, তখন তাই হবে। কিন্তু একটা বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখবে, যে কেও যেন তোমাকে আমার কুটিরে আসা যাওয়া করতে না দেখে।"

              পতিতা প্রথম দিনেই কয়েক রকমের পদ বানিয়ে পন্ডিতের সামনে পরিবেশন করল। যেই মুহুর্তে পন্ডিত খাবার মুখে তুলতে যাবেন, অমনি পতিতা পন্ডিতের সামনে থেকে খাবারের থালাটি কেড়ে নিয়ে নিল। পতিতার এমন আচরণ দেখে তো পন্ডিত রেগে আগুন। বললেন "এ কেমন রসিকতা তোমার? আমার সামনে থেকে থালা সরিয়ে নাও তুমি, এত বড় দুঃসাহস?"

তখন পতিতা স্মিত হেসে বলল, "এটা রসিকতা নয় পন্ডিতবাবু, এটাতো আপনার প্রশ্নের উত্তর।"

              পতিতার কথা কিছু বুঝতে না পেরে পন্ডিত তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। পন্ডিতের চাহনি দেখে পতিতা বলল, "পন্ডিতবাবু, এখানে আসার আগে পর্যন্ত আপনি কারও হাতে বানানো কোন খাবার তো দূর, কারও হাতে ছোঁয়া জল পর্যন্ত পান করেন নি। অথচ দেখুন, আজ স্বর্ণমুদ্রার লোভে আপনি আমার মত মানুষের হাতে বানানো খাবার পর্যন্ত খেতে রাজী হয়ে গেলেন। পন্ডিতবাবু..এই লোভই হল পাপের গুরু। এখন নিশ্চয় আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন"। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কৃষ্ণ কেন রাধাকে বিয়ে করেননি যেখানে তিনি এতগুলি বিবাহ করেছিলেন ? তবে কেন তার রাধার সাথে নাম নেওয়া হয় ?

ধর্ম পৃথিবীতে কিভাবে এলো ?

সূর্য বংশীয় রাজা এবং চন্দ্র বংশীয় রাজা কাদের বলা হয় ?