কলিযুগের সংকেত
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কয়েক বছর পরের ঘটনা। একদিন পঞ্চপাণ্ডব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে গিয়ে বলে " হে মধুসূদন, আমাদের মন বড় বিচলিত হচ্ছে, রাজকার্যে মন বসছে না তাছাড়া এমন কিছু সমস্যা আসছে যা আমাদের বিচার বুদ্ধির বাইরে।"
তাদের কথা শুনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন " কলিযুগ আসন্ন তাই কলির প্রভাবে এরূপ সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তোমরা সবাই ভ্রমণে বেরিয়ে যাও, প্রত্যেকে আলাদা আলাদা যাবে। তোমরা প্রত্যেকেই কিছু আশ্চর্য জিনিস দেখবে, যাও সন্ধ্যা বেলা আলোচনা হবে।"
শ্রীকৃষ্ণের কথা মত সবাই আলাদা ভাবে বেরিয়ে যায় এবং সন্ধ্যেয় ফিরে এসে তারা আলোচনায় বসলো।
প্রথমে যুধিষ্ঠির বললো, সে পথে চলতে চলতে হটাৎ দেখে "একটি হাতি যার দুটি শুড়, সেই হাতিটি একটি সরু নলের এপার দিয়ে ঢুকে ওপার দিয়ে বেরিয়ে গেলো কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে তার লেজ তাতে আটকে গেলো।"
শ্রীকৃষ্ণ এর ব্যাখ্যায় বললেন, " তুমি যে হাতিটি দেখেছো তা শাসক শ্রেণীর প্রতীক, আর তার দুটি শুঁড়ের অর্থ কলিযুগে শাসক শ্রেণী প্রজাদের একাধিক ভাবে শোষণ করবে। আর যখন তার বিচার হবে তখন সেই শাসক দলের মধ্যে মূল সূত্রধর তো বেচে যাবে, ফাঁসবে শুধু ছোটো উলুখগড়া গুলো। তাই সেই হাতি নল এর মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে গেলেও তার লেজ ফেঁসে যায়। "
এর পর অর্জুন বলা শুরু করলো, অর্জুন দেখলো "একটি বাঁজপাখি যার ডানায় স্বর্ণাক্ষরে বেদমন্ত্র খোদাই করা কিন্তু সেই বাজ একটি জীবন্ত খরগোশ কে ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে।"
শ্রীকৃষ্ণ এর ব্যাখ্যায় বললেন, " কলি যুগে পাপ ধর্মের আড়ালেই লুকিয়ে থাকবে, ভন্ড ভক্তির আড়ালে অসংখ্য পাপী মূর্খ মানুষদের কাছে পুজনীয় হয়ে উঠবে, তারা বুঝতেও পারবে না যে সেই ভন্ডের দল বেদ মন্ত্রের আড়ালে তাদেরকে ছিড়ে খাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তোমার দেখা দৃশ্য তারই প্রতীক মাত্র।"
এরপর ভীম বললো, " আমি দেখলাম একটি গাভী তার বাছুরকে আদর করে চাটছে, এত চাটছে যে বাছুরটির সম্পূর্ণ শরীর লাল হয়ে গেছে, সে যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, তার পরেও তার মা তার শরীর চেটে যাচ্ছে।"
এর ব্যাখ্যায় শ্রীকৃষ্ণ বললেন, " কলিযুগে মাতা-পিতার অতিরিক্ত অন্ধ স্নেহই সন্তানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে উঠবে কিন্তু তার মাতা-পিতা তার বিন্দুমাত্র আভাস পাবে না।"
এরপর সহদেব বললো, " আমি একটি অত্যন্ত গভীর কুয়া দেখলাম কিন্তু আশ্চর্য তাতে এক বিন্দুও জন নেই, যেখানে তার পাশের সরোবরে জল আছে।"
শ্রীকৃষ্ণ বললেন, " কলিযুগে মানুষ তার অহংকার ও প্রতিপত্তি দেখানোর জন্য অনেক অর্থ সম্পদ ব্যয় করবে কিন্তু তার কিছু মাত্র সম্পদও সে কোনো দরিদ্র কে দান করবে না।"
এরপর নকুল বললো " আমি দেখলাম একটি বিশাল শিলাখন্ড পর্বতের ওপর থেকে পড়ছে, তার সামনে বড় বড় গাছ ও পাথর চুর্ন হয়ে যাচ্ছে, কোনো কিছুই তাকে আটকাতে পারছে না কিন্তু হঠাৎ সে একটা ছোট্ট ঘাসে আটকে গেলো।"
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, " যখন মানুষ সম্পূর্ণ দিশাহীন হয়ে মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ রূপে ভেঙে পড়বে, তখন নাম, যশ, অর্থ, প্রতিপত্তি কোনো কিছুই তাকে কোনো আশা যোগাতে পারবে না, তখন এই তৃণতুল্য হরিনামেই তার মুক্তি হবে।"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন