ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পীত বস্ত্র পড়ে থাকতে কেন দেখে যায় ? হলুদ এখানে কিসের প্রতিনিধিত্ব করে ? এবং কী বোঝায় ?
"ईश्वरः परमः कृष्णः सच्चिदानन्द विग्रहः।
अनादिरादि गोविन्दः सर्वकारण कारणम्॥"
অর্থাৎ: "ভগবান শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর, তার রূপ শাশ্বত এবং আনন্দময়। তিনি অনাদির আদি এবং সকল কারনের কারন।"
ওপরের শ্লোকটির মধ্যে কিছুটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে।
"হলুদ রং মনকে সর্বদা আনন্দ দেয়", আর ভগবান সচ্চিদানন্দ স্বরূপ। এই কারনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে সর্বদা এক মধুর হাসি থাকে এবং আমরা তার মধুর 'মুরলীধর' রূপকেই পূজা করি। যেখানে অন্যান্য দেবদেবী তাদের অস্ত্র সহিত পূজিত হন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেখানে তার মুরলী মনোহর রূপে পূজিত হন যা ভগবানের সচ্চিদানন্দ স্বরূপকেই দেখায়।
হলুদ রং 'আশা এবং ভরসার' প্রতিনিধিত্ব করে। একজন অস্তিক এবং একজন নাস্তিকের এই আশা ভরসার পার্থক্যই থাকে। নাস্তিক যিনি বাস্তববাদী এবং বিজ্ঞানে বিশ্বাসী, প্রমান ছাড়া তিনি কিছুই বিশ্বাস করেন না, তাহলে ভগবানের প্রতি তার বিশ্বাস কেন থাকবে ? কিন্তু এখানে একটি ক্ষেত্রে সে আস্তিকদের চেয়ে দুর্বল। মানুষ যতই আত্মবিশ্বাসী হোক, সে যতই উন্নতি করুক কিছু পরিস্থিতি এমন থাকে যখন সবরকম চেষ্টা করেও মানুষ পরিস্থিতির সাথে পেরে ওঠেনা। তখন সে সম্পুর্ণ ভেঙে পরে। কিন্তু যে আস্তিক তিনি এই রকম পরিস্থিতিতে তুলনামূলক ভাবে কম ভেঙে পড়েন, কারন তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি বিপদে পড়লে একজন তাকে রক্ষা করবে, তিনি পথ ভুলে গেলে একজন তাকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
মহাভারতে দ্যুতসভায় 'দুঃশাসন' যখন 'দ্রৌপদীর' বস্ত্রহরণের চেষ্টা করছিল তখন দ্রৌপদির শত করুন প্রর্থনাতেও 'ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর এবং তার পঞ্চস্বামী' কেউ তার কোনো প্রকার সাহায্য করলো না। "তখন দ্রৌপদি ভুলে গেলেন রাজসভা, ছেড়েদিলেন তার শাড়ি দুঃশাসনের হাতে, তিনি ভুলে গেলেন সমস্ত লাজলজ্জা, দুহাত উপরে তুলে করজোড়ে গোবিন্দ কে ডাকতে থাকলেন।" ভগবানের তার এতটাই বিশ্বাস ছিলো যে ভগবান সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হয়ে তার লাজ রক্ষা করলেন।
"ভগবান সর্বদা বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল", এই কারনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পীত বস্ত্রে দেখানো হয়।
হলুদ রং 'বন্ধুত্বেরও' প্রতিনিধিত্ব করে। যখন যখন শ্রেষ্ঠ বন্ধুত্বের উদাহরণ দেওয়া হয় তখন সর্বপ্রথম 'কৃষ্ণ-সুদামার' নাম উচ্চারিত হয়।
এছাড়া হলুদ রং 'আত্বজ্ঞানের' প্রতিনিধিত্ব করে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তো আত্বজ্ঞানের আধার।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একদিন হঠাৎ জানতে পারলেন দে নন্দ ও যশোদা তার পিতা-মাতা নয়, এবং তিনি তাদের ছেড়ে মথুরা চলে গেলেন। তার প্রাণপ্রিয়া রাধা কে তিনি চিরকালের জন্য ছেড়ে চলে গেলেন। এরপর তিনি কংস বধ করলেন কিন্তু মথুরার রাজা হলেন না। তিনি দ্বারকা নির্মাণ করলেন সেখানেও তিনি সিংহাসনে বসলেন না। তার জেষ্ঠপুত্র প্রদ্যুম্নের জন্মের কিছুদিন পরেই অসুররাজ শম্বরাসুর তাকে অপহরন করলো। তার প্রিয় ভাগ্নে অভিমন্যু যুদ্ধে বীরগতি প্রাপ্ত হয়। দ্রৌপদী তার পুত্রদের মৃত্যুর জন্য শ্রীকৃষ্ণ কে দায়ি করে এবং গান্ধারী তো শ্রীকৃষ্ণ কে যুদ্ধের কারন মনে করে যাদবগনের ধ্বংসের অভিশাপ দেয়। তার প্রিয় পত্নী রুক্মিনীর সাথে বিবাদ হয়, তার সম্পুর্ণ বংশ তার চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি অগ্ৰজ বলরাম, যিনি সর্বক্ষন তার পাশে ছিলেন তিনি দেহত্যাগ করেন। কিন্তু এই সকল ঘটনার বিন্দুমাত্র দুঃখ তার নেই। কারন তার কাছে আত্মজ্ঞান ছিলো, তিনি জানেন যে 'যা হয়েছে ভালো হয়েছে।' এমনকি যখন জরা নামক ব্যাধ তাকে শরবিদ্ধ করেন তখনও তিনি তাকেও আশির্বাদ করলেন।
এই সকল কারনেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পীতবস্ত্র পরিধান করেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন